RSS ফিড

চৌর্যবৃত্তি ও প্রভাবিত কবিতা (দ্বিতীয় কিস্তি)

ঋণস্বীকার না করে অন্যের লেখার ভাব, ভাষা, গানের সুর নিজের বলে চালিয়ে দেয়াটাই চৌর্যবৃত্তি বা কুম্ভিলকবৃত্তি।  এমনকি অন্যের গ্রন্থ নিজের নামে চালিয়ে দেওয়াটাও চৌর্যবৃত্তি। ইংরেজিতে চৌর্যবৃত্তিকে Plagiarism বলা হয়।  “use, without giving reasonable and appropriate credit to or acknowledging the author or source, of another person’s original work, whether such work is made up of code, formulas, ideas, language, research, strategies, writing or other form.” (“What is Plagiarism”. Stanford University. 2012-07-27) সংজ্ঞা দিয়ে বিপদে পড়লাম, এর নগদ উদাহরণ চাইতে পারেন কেউ কেউ। রবীন্দ্রনাথ থেকে উদাহরণ দেয়ার কাজটা সারা যাক। তিনি ঋণস্বীকার না করে গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে’ ও স্কটল্যান্ডের কবি রবার্ত বার্নসের ‘Ye Banks and Braes o’ Bonnie Doon’ (১৭৯১) গানের সুর হরণ করেছেন। উক্ত দুটো সুর তিনি যথাক্রমে ‘আমার সোনার বাংলা’ ও ‘ফুলে ফুলে দোলে দোলে’ গানে ব্যবহার করেছেন।

‘আমার সোনার বাংলা’ গীতিকবিতাটি আহামরি কিছু নয়। গগনের হদয়স্পর্শী সুরের কারণেই এটি যেকোনো শ্রোতার কাছে সুন্দর লাগছে। tagore_71052শুধু সুর নয়, এ-দুটো গীতিকবিতার স্ট্রাকচারও তিনি হরণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করেছেন, কোনকালে কেউ তার চৌর্যবৃত্তি আবিষ্কার করতে পারবেন না। বাংলার সাধককবি লালন ও ইউনানি কবি রুমির অধ্যাত্ম্যবাদী চিন্তাই খুঁজে পাওয়া যায় তার বেশিরভাগ গীতকবিতায়। ‘খাঁচার অচিন পাখি’ কিংবা ‘বাড়ির পাশের পড়শিরা’ই তার ‘হিয়ার মাঝে লুকিয়ে আছে’। তার গদ্য সাহিত্যও ভেজালযুক্ত। প্রমথনাথ সেনগুপ্তকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়া ‘বিশ্বরচনা’কে আত্মপ্রতারক রবীন্দ্রনাথ যে-কৌশলে ‘বিশ্বপরিচয়’ বানিয়ে নিজের নামে প্রকাশ করেছেন, আজ সে চাতুর্যপূর্ণ কাহিনিও কোনো কোনো লেখকের আলোচনায় উঠে আসছে।

যা হোক, এবার পূর্বের ধারাবাহিকতায় কয়েকটি কবিতার উপর ব্যক্তিক উপলদ্ধি তুলে ধরব এবং আবু হাসান শাহরিয়ারের মতো কাউকে নবিশ কবি (অপরিপক্ক কবি) কাউকে পরিপক্ক কবি না-বলে সমসময়ের কয়েকজনের কবিতা নিয়ে কথা বলা যাক।

ময়ুখ চৌধুরীময়ুখ চৌধুরী ‘মা বলেছেন’(অর্ধেক রয়েছি জলে অর্ধেক জালে, ১৯৯১, পৃ. ৫৪)-এর মাধ্যমে একটি চমৎকার দৃশ্যকল্প হাজির করেছেন। এখানে দু’টি দৃশ্যের খানিক উপমিতি তুলে ধরার মাধ্যমে, গোত্রপরিচয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ‘তারা কাঁদছে’ এবং ‘মা কাঁদছেন’ দ্বারা ‘মা হচ্ছেন তারা’ বা ‘তারা হচ্ছে মা’ প্রমাণ করে আংকিক বা সহানুমানিক (Syllogistic) সিদ্ধান্ত টানা হয়নি। কবিতারূপ দেওয়ার জন্য দুটো বচনকে ‘তবে কি মা, তুমি তারার  বোন’ এ রূপান্তরিত করা হয়েছে।

        মা বলেছেন যাসনে খোকা ছাদে
        ঐখানেতে রাতবিরেতে  তারারা সব কাঁদে

        তবে কি মা, তুমি তারার বোন
        অনেক আগে দেখেছিলাম কাঁদতে
        সাক্ষী আছে স্তব্ধ সিঁড়ির কোণ।
(মা বলেছেন/ময়ুখ চৌধুরী)

fuad-hasanশিশুটি যে মাকে তারার বোন বলে বসবে – একথা মায়ের অজানা ছিল। আবার শিশুটির অজানা ছিল- ছাদে গিয়ে তারার কান্না দেখে কাঁদতে শুরু করলে মায়ের সাথে (তার বোধঅনুযায়ী) তার মা-সন্তান সম্পর্কে অনৈক্য তৈরি হবে কিনা। (বাস্তবে মা কি তারার বোন? তারারা কি কাঁদে?)। শিশুরা কাণ্ডজ্ঞানশূন্য বলে তারার কান্নার সাথে মায়ের কান্নার সাযুজ্য পেয়ে যেমন মাকে তারার বোন বলতে পারে, তেমনি বাসার পাশে খুঁজে পাওয়া পরিত্যক্ত কিছু মুখে নিয়ে ফুলিয়ে-উড়িয়ে মজা করতে পারে। এখানে, মনে হচ্ছে, কাণ্ডজ্ঞান তৈরি হবার আগে একটি শিশুর মানসিক অবস্থা কিরূপ থাকতে পারে, তার একটি কাব্যিক উদাহরণ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। সমসাময়িক কবি ফুয়াদ হাসানের ‘অবুঝ প্রশ্ন-উত্তর’(সাহিত্য সাপ্তাহিকী, দৈনিক আজাদী, ১৬ এপ্রিল ২০০৪) ময়ুখ চৌধুরীর এ-কবিতার মতো সমান ভাবপ্রকাশকারী।

        কান্নারত মুনাজাত শেষ হলে
        অবুঝ শিশুটি মাকে জিজ্ঞেস করে
        ‘খোদা কোথায় থাকেন?
        মায়ের উত্তর- ‘ঐ আকাশে…’

        অঝড় বৃষ্টি দেখে
        শিশুটিও বলে বসে,
        ‘তোমার কান্না দেখে খোদা বুঝি কাঁদেন!’
(অবুঝ প্রশ্ন-উত্তর/ফুয়াদ হাসান)

‘কান্নারত’ শব্দটির অনুপযুক্ত ব্যবহারের কারণে ‘অবুঝ প্রশ্ন-উত্তর’ এর প্রথম স্তবক সুশ্রাব্য নয়। শব্দের অনুপযুক্ত ব্যবহারজনিত সমস্যা কবিতার সৌন্দর্যোপভোগ যাাত্রাপথে বাধা সৃষ্টি করে। এখন উপর্যুক্ত কবিতাটি কিভাবে ‘মা বলেছেন’ কিসিমের, সমীকরণের সাহায্যে দেখানো যাক-

ছাদ = আকাশ
ছাদে গিয়ে শিশুর তারার কান্না দেখা = আকাশে খোদা থাকেন,
আকাশ হতে বৃষ্টি পড়তে দেখা
মায়ের কান্না দেখা = মোনাজাতরত মায়ের কান্না দেখা
তুমি তারার বোন = খোদা কাঁদেন।

আবু হাসান শাহরিয়ারের নিরন্তরের ষষ্ঠীপদী কাব্যগ্রন্থের ‘১’ চিহ্নিত অংশটি পড়া যাক। এখানে পরোক্ষভাবে এখনকার নারীদের বিষয়াসক্তির আতিশয্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

        কেউ তোমাকে মোহর দেবে, কেউ দেবে ভাগ রাজ্যপাটে
        কেউ বসাবো সিংহাসনে, কেউ বসাবে সোনার খাটে
        কেউ পরারে রুপোর খাড়–, কেউ পরাবে সাতনরী হার
        যার কিছু নেই সে-ও ওড়াবে হাজার ফানুস বিমুগ্ধতার

        দু’চার পঙ্ক্তি কাব্য ছাড়া আমার দেবার আর কি আছে?
        নরস কাব্যগ্রন্থ পুরে পাঠিয়ে দেব তোমার কাছে।

আবু হাসান শাহরিয়ারকালিদাস-কমলার বৈবাহিক জীবনের প্রারম্ভিক পর্বের একটি ঘটনা সম্পর্কে কেউ কেউ অবগত। ঘটকের চাতুর্যপূর্ণ ঘটকালির মাধ্যমে কালিদাস কমলাকে বিয়ে করে বাসরঘর পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছেন। কিন্তু কমলা তাকে জলযোগ না-দিয়ে এই বলে তাড়িয়ে দেন যে, যে-দিন জ্ঞানে-বিদ্যায় অদ্বিতীয় হয়ে আসবেন, সে-দিন তাকে আশা করা যাবে। কালিদাস এমন জ্ঞানী হয়ে কমলার সহবাস পেলেন, তার হাত থেকেই আমরা পেলাম মেঘদূতম। উপর্যুক্ত কবিতায় লক্ষ করি, বর্তমানের এক কালিদাস পূর্বের এই কমলার চাহিদা (আকাঙ্ক্ষা) অনুযায়ী জৈবনিক যোগ-বিয়োগের কাজ সারতে চাচ্ছেন। কিন্তু এইকাজে সর্বক্ষেত্রে সাফল্য আসবে বলে মনে হয় না। কারণ সেই উজ্জয়িনী এখন নেই, গঙ্গায় অনেক জল গড়িয়েছে। সমাজের বাহ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি লক্ষণীয় আন্তর্পরিবর্তনই জানিয়ে দিচ্ছে, এখনকার কমলারা মেঘদূতএ নয়, বিলাস নিবাসেই সুখের সন্ধান করে যাবে। তা-ই ঘটেছে এ-কবিতার কালিদাসের বেলায়। সে যা-হোক, শাহরিয়ারের এ-কবিতায় প্রিয়পাত্রের কাছে একজন গরিব কবির যে-অভিপ্রায়ের প্রকাশ, ঠিক তা-ই লক্ষ করি সমসময়ের কবি চন্দন চৌধুরীর ‘লহো মোর শব্দের অঞ্জলি’তে।

        তোমাকে দেবার মত কিছু নেই এই গরিব কবির।
        নেই অর্থ-বিত্ত বিষয় আশা প্রতিপত্তি,
        গাড়ি নেই, নেই কোন মন-মাতানো আলিশান হাবেলি,
        কার্পেট বিছানো ঘর;
        
        দেখো! কৃষ্ণচূড়া ফুটেছে এ হৃদয়ে আমার;
        ফুটেছে অপূর্ব শব্দের ফুল, বর্ণমালার ঝর্ণাধারা,
                             অমর কবিতা।    

                           …
        তোমাকে দেবার মতো আর কি আছে আমার!
        নিয়ে যাও এই পাণ্ডুুলিপি, বাক্যমালা
                      শুদ্ধ শব্দরাশি।
(লহো মোর শব্দের অঞ্জলি/চন্দন চৌধুরী)

chandan-chowdhuryচন্দন চৌধুরীর কবিতাটি রয়েছে তার লহো মোর শব্দের অঞ্জলি (১৯৯৯, বিশাকা, ঢাকা) কাব্যগ্রন্থে। উল্লেখ্য, দু’জনের কাব্যগ্রন্থদ্বয় ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা থেকে প্রকাশিত। গ্রন্থভুক্ত হওয়ার আগে এ-দুটোর কোনটি কখন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে তা অজ্ঞাত। ফলে ধারণার দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। হয়ত আবু হাসান শাহরিয়ারের ‘১’ ১৯৯৯ সালের আগে কোনো কাগজে পেয়ে চন্দন চৌধুরী সমভাবের ‘লহো মোর শব্দের অঞ্জলি’ লিখেছেন। এমন করতে পারেন। কারণ তিনি শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’র দৃশ্য নিয়ে ‘সূর্যবন্দনায় কুমারী-জননী’ (ঐ, পৃ. ১৭) রচনার (…)সাহস দেখালেন।

 দ্যাখো! দ্যাখো!
    গেরামের গফুর মিয়ার ঘুম গ্যাছে পালিয়ে প্রবাসে,
    ফরিদ আলীর ঠেলাগাড়ির চাকা ঘুরেনা শহরে এখন,
    গরব  মুন্সী গরুর গাড়ি চালায় না আর,
    দিতি দেবী কপালে লাগায় না সিঁদুর, পরে না শাখা নূপুর,
    রহিমা বিবি বাঁধে না বেণী, লালফিতা,
                     শরীরে মাখে না রয়নার তেল।

    এদিকে আবার
    মতির থুত্থুরে মা পালিয়েছে ছনের ঘর ছেড়ে,
    মনা মাঝি ঘাটের ওপাশে ডুবিয়ে দিয়েছে নৌকা,
    ইমন লিমন যায়নি মাঠে ওড়াতে ব্যোম ঘুড়ি।

    স্বাধীনতাকামী শত্র“ঘœ-সময়ে বাংলায় হাসেনি কোন মুখচ্ছবি
    অনন্ত অন্ধকারের মাঝে এখন যেঁ শিমুল ফুটবে
                     … তুমি বাংলাদেশ।
(সূর্যবন্দনায় কুমারী-জননী/চন্দন চৌধুরী)

হয়তো এমনও হতে পারে, প্রকাশ-উন্মুখ চন্দন চৌধুরী দৈনিক যুগান্তরের ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে প্রকাশ করতে কবিতাটি  পাঠিয়েছেন, আবু হাসান শাহরিয়ার তাকে নিজের মতো করে সাজিয়েছেন। তিনি এমন করতেও পারেন। (প্রথম অংশে শঙ্খ ঘোষের ‘তুমি’র সাথে তার ‘অকুলচারীর পাঠ্যসূচি’ তুলে ধরে দেখিয়েছি)। আবার এমনও হতে পারে, আমরা কাকতালীয়ভাবে দু’জনের  কলম থেকে একই কিছু পেয়ে গেলাম। তবে, এ-ক্ষেত্রে, বাক্যিক মিল ও উদ্দেশ্যকে অগ্রাহ্য করি কীভাবে? হ্যাঁ, দুজনের কবিতায় একটা শব্দ বা বাক্যের অপ্রত্যক্ষ মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। এ-মিল থাকা যে দোষের  নয়, তা কবিতাদ্বয় পাশাপাশি রেখে পড়লেই আঁচ করা যায়। বাক্যের গঠন, উদ্দেশ্য ইত্যাদি ব্যাপার আমলে নিয়ে যে কোনো কাব্যপাঠক বলতে বাধ্য – কবিতাদ্বয় এক নয়। অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়ের উত্তর ঔপনিবেশিক বাংলা কবিতা (বইমেলা-২০০৭, উর্বী প্রকাশন, কলকাতা) গদ্যগ্রন্থের ‘উত্তর ঔপনিবেশিক বাংলার কাব্য-রাজনীতি’ গদ্যে উদ্ধৃত অরণি বসুর ‘বন্ধুর বাড়ি’ কবিতাটি পড়ার পর আবু হাসান শাহরিয়ারের ‘একাকী জীবন হাঁটি আমি আর আমার’ এবং ইতোপূর্বে প্রকাশিত আমার ‘স্বীকারোক্তি’ (প্রথমে মনিরুল মনির সম্পাদিত খড়িমাটির ৫ম সংখ্যা ২০০৭-তে এবং পরে ‘বাঁচনভঙি-২’ শিরোনামে দৈনিক পূর্বকোণএ) কবিতার কথা মনে পড়ল। শাহরিয়ারের কবিতাটি গদ্যকার আবদুর রবের ‘কবিতার মানচিত্র ৬’ (১৯ জুন ২০০৮, সাপ্তাহিক কাগজ, সম্পাদক- নাঈমুল ইসলাম খান)-এ উদ্ধৃত পেয়েছি।

    যা যা চাও সব পাবে বন্ধুর বাড়িতে:
    ভাঙা সোফা, ফড়িং বালক আর দাড়িওয়ালা কাক
    সর্বোপরি পাবে এক বালকের ছদ্মবেশে রিটায়ার্ড বুড়ো
             মনো সুখ আছে যার আছে পুনঃপুনঃ জ্ঞান বিতরণ।
    সকলেই কবি তারা, সকলেই, শুধু সোফা নয়,
             সেই ফড়িংও তো কবি
    আমি যে তাদেরই বন্ধু, খর্বকায় কৃকলাস
    আমিও কি কবি নই? যত কবি রণজিৎ দাশ?
(বন্ধুর বাড়ি/অরণি বসু)

এবং
                          পাখিরা বাঙ্ময় কবি; প্রকাশিত
    গ্রন্থাবলি নেই। চরিতাবিধানে তাই
                     পাখিদের নাম নেই কোনও । যদিও
    কোকিলই আজও পৃথিবীর
                 জনপ্রিয় কবি। তত্ত্বের ধুতুরা
    ফোটে তোমাদের বুদ্ধির বাগানে।
                     ছাপাখানা থেকে আজ চাররঙা
    কভার এসেছে। ঘরে ঘরে চ’লে
                     যাবে তোমাদের বুদ্ধিবাজ বই।
শিবিরে শিবিরে হবে কবিতার
                 ভাগ বাটোয়ারা। এখানেই আঁতুড়
ঘর, দূরের শ্মশানে চলে চিতা।
                 একাকী জীবন হাঁটি আমি আর
আমার কবিতা।
(একাকী জীবন হাঁটি আমি আর আমার/আবু হাসান শাহরিয়ার)

আমার কবিতাটি-

কর্ণফুলি দেখায় তার বুকের ওঠানামা, বন্দর-টু-কোতোয়ালি-বিলবোর্ড,
পতিত মানুষ, বাতাস আর ওড়না। পাশে ডিসিহিল আর আশীষ সেন :
সবকিছু ভুয়া, সত্য কেবল অরুণ দাশগুপ্ত, জ্যোতির্ময় জ্যোতির্ময়।
চেরাগির মোড়- ফুটপাত কোল দেয়, শিশুযিশু বসে থাকি। তোমরাও
দেখো, নন্দনকানন-জামাল খাঁ আর মোমিন রোড দৌড়ে এসে একসাথে
ঢুকে পড়ে চোখে, মুখের ভেতর। এই কর্ণফুলিরাই কবি, আমার
 চোখ ধরে টানে, পা-দুটো দখলে রাখে নিজস্ব নির্মাণে,
আমার হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে কবিতার কোমর,
আমি কোনো কবি নই।

অরণি বসু ও আবু হাসান শাহরিয়ারের উল্লেখিত কবিতায় তাদের কবি স্বীকৃতিপ্রাপ্তির উদ্ব্যক্তি লক্ষণীয়। অনির্বাণ মুখোপাধ্যায় অরণি বসুর কবিতাটি তুলে ধরে বলেছেনও : “এই কবিতাটিতে…এক আইকন বন্ধু কবির (দেশ পত্রিকার কবিতার পাতা সম্পাদনার দায়িত্ব যার হাতে ন্যস্ত হয় তাকে আইকন বলা হচ্ছে) দমচাপা বর্ণনা রয়েছে, যেখানে সবাই কবি, খালি সংশয় নিজেকে নিয়ে, নিজের কবিযশের স্বীকৃতি নিয়ে। ‘রণজিৎ দাশ’ এখানে নিমিত্ত মাত্র, শুধুমাত্র তার নামটি এখানে ছন্দরক্ষার খাতিরে ব্যবহৃত। যাই হোক না কেন, এ কবিতা যে যশোপ্রার্থী তরুণ কবির হাহাকার ফুটিয়ে তুলেছিল, যে বিষয়ে সন্দেহ নেই।” শাহরিয়ারের কবিতাটির ‘… কোকিলই আজও পৃথিবীর/জনপ্রিয় কবি। তত্ত্বের ধুতুরা/ফোটে তোমাদের বুদ্ধির বাগানে।/…একাকী জীবন হাঁটি আমি আর/আমার কবিতা’ পঙ্ক্তিগুলোতেই পাওয়া যাবে তার কবিসত্তার আত্মজাহিরি। আবদুর রবও বলেছেন, ‘পাখি ও কোকিল (তিনি আলাদা করে দেখিয়েছেন) কবিস্বীকৃতি পেলেও, শাহরিয়ার এদের কাউকে কবি হিসেবে অভিপ্রায় করেননি। এদেরকে কবি বলার উদ্দেশ্য তিনি নিজেই নিজেকে পাখির মতো বাঙময়, কোকিলের মতো সুকণ্ঠী ও জনপ্রিয় কবি হিসেবে প্রচার করার উদ্দেশ্যে এই গল্প ফেঁদেছেন’। তাদের দু’জনের কবিতার সাথে আমার কবিতার তফাৎ এখানেই : আমার কবিতায় অকপটে স্বীকৃত – ‘আমি কোনো কবি নই’। তারা কেউ ফড়িংকে, কেউ পাখিদের কবি বলেছেন। এ-জায়গায়, অজান্তে, আমার কবিতায় আমি ছাড়া বস্তুজগতের সবকিছু কবি হিসেবে স্বীকৃত। একটা কবিতাকে দুষ্ট বলা যাবে তখনই, যদি এর কিছু বাক্য-শব্দবন্ধ (বাক্যগুলোর মূলভাব-উদ্দেশ্য অনেকটা একই বা শব্দবন্ধগুলো অবিকল) পূর্বপ্রকাশিত অন্য কবিতার সাথে মিলে যায়। এ-ব্যাপারে পরবর্তী অংশে যুৎসই উদাহরণ হাজির করেছি।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: