RSS ফিড

সবুজ তাপস ও ‘জলপাড়া’ / শফিক হাসান

জলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ অতি আদি হতেই। সাগর, নদী কিংবা পুকুরের কাছে মনের কথা জানিয়েছে মানুষ বরাবরই। কোন-কোন দেশ ও জাতির জলনির্ভরতা সেই আদিকাল হতে এখনও বিদ্যমান। শুধু তাই নয়, কোন-কোন সম্প্রদায়ের পূজ্য বস্তুও এই জল। ইউনানি দার্শনিক থেলিসের দর্শনতত্ত্ব গড়ে উঠেছে এই জলকে ঘিরেই: সবকিছুই জলপ্রসূত, জলের অবস্থাভেদেই আজকের এই দুনিয়া। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব জলের কথা বলে সচ্চিদানন্দ লাভ করতে গেলেন। তিনি বলেছেন, “একটি জলাশয়ের অনেক ঘাট আছে। একটি ঘাটে হিন্দুরা জল সংগ্রহ করে, অন্য ঘাটে মুসলমানেরা পানি সংগ্রহ করে; এবং তৃতীয় আর একটি ঘাটে খ্রিস্টানরা সংগ্রহ করে Water। আমরা কি ভাবতে পারি যে, জল শুধু পানি এবং ডধঃবৎ, জল হবে না? এগুলো একই বস্তুর বিভিন্ন নাম মাত্র, এবং সবাই একই বস্তুর অন্বেষণ করছে।” লালন বললেন, ‘নদীর জল কূপজল হয়,/ বিল কিংবা বাওড়ে বয়,/ সাধ্য কি আর সেই গঙ্গাতে যাই/ গঙ্গা না এলে কাছে,/ জীবের জন্য ভজন বৃথা/ তোমার দয়া যারে দয়াল,/ আমায় রাখিলেন সাঁই কূপজল করে আধলা পুকুরে’।  এই জলকে ঘিরেই কবি সবুজ তাপসের ‘জলপাড়া’।বলে রাখি, কবি সবুজ তাপসের কবিতার প্রতি আমার আগ্রহ জেগেছে তানভীর মাসুদের সাথে পরিচয়ের পর। ২০০৭ সালের দিকে। তানভীর কবি তাপসের কিছু কবিতা এবং তার লেখা একটি বিশ্লেষণধর্মী গদ্য ‘সবুজ তাপসের বাঁচনভঙি: দার্শনিকতাপূর্ণ কবিতানুক্রম’ (১৪ জানুয়ারি ২০১১, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, দৈনিক পূর্বকোণ) আমাকে দিয়েছেন। কবিতাগুলো পড়ে আমি মুগ্ধ হলাম এবং বুঝলাম, তার কবিতার বোধ চয়ন করতে গেলে পাঠকের দর্শন জানা জরুরি। তানভীরের কাছে কবির একটা কাব্যগ্রন্থ চেয়েছিলাম, বললেন- এ-কবির কোন কাব্যগ্রন্থ এখনো আলোর মুখ দেখেনি। কথাটা শুনে বিস্মিত হলাম। একজন ভালো কবিতালিখিয়ের কোন কাব্যগ্রন্থ নেই! যা হোক, তখন থেকেই আমি এই কবির একজন নিয়মিত পাঠক। প্রথম পাঠেই ‘জলপাড়া’ কবিতাটি  ভালো লাগলো।

সবাই সাগর হবে না, কেউ কেউ নদী / সবাই নদী হবে না, কেউ কেউ দিঘি / সবাই দিঘি হবে না, কেউ কেউ পুকুর / সবাই পুকুর হবে না, কেউ কেউ ডোবা…/ অথচ সাগর, নদী, দিঘি, পুকুর, ডোবা…/ সবার ভেতরে জল আছে, জলের শোভা। (জলপাড়া)।

‘জলপাড়া’ একটি সরল শরীরের কবিতা। এখানে কতকগুলো জলাধারের নাম উল্লেখ করে কবি বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের  অবস্থান জানান দিয়েছেন। ‘সাগর’, ‘নদী’র মতোন শব্দগুলো মানুষের ভেতরকার অসাম্যের প্রতীক। কবিতাটির ইংরেজি ভাষান্তরও পেলাম। এর ইংরেজি শরীরটাও খুর সরল: All won’t be sea,/ Some will be river./All won’t be river,/Some will be deeghi*./All won’t be deehhi,/Some will be pond./All won’t be pond,/Some will be pool…/But in all, sea or pool,/There is water beautiful। কবি হয়তো এখানে সকল মানুষ যে কখনো অর্থনৈতিক ও মানসিক দিক থেকে এক লেবেলে থাকবে না, তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অর্থাৎ মানুষের শ্রেণিবিভাগ তুলে ধরেছেন। শ্রেণিবিভাগ নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। মার্কসবাদ মানুষের শ্রেণিবিভাগ আশা করে না, Classless Society-এর কথা বলে। এ-শ্রেণিহীন সমাজেরও সমালোচনা রয়েছে। এ-সমাজও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানুষকে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। সবুজ তাপস দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন, ‘সবাই সাগর হবে না, কেউ কেউ নদী’। এটা সত্য যে, শ্রেণিবিভাগ প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের পরিচায়ক, এ-বৈচিত্র্য ভারসাম্য রক্ষার শাশ্বত বিধান। কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু থাকবেই। যদি তা না থাকে, প্রাকৃতিক প্রতিযোগিতা ধ্বংস হয়ে যায়। জগতের এই প্রতিযোগিতা একটা অর্থবহ ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থেই। কবি মানুষের শ্রেণিবিভাগ স্বীকার করে নিয়েছেন সত্য, সবার ভেতরে যে এক জায়গায় মিল রয়েছে, তাও উল্লেখ করেছেন। ‘সবার ভেতরে জল আছে, জলের শোভা’। এ-মিল হতে পারে রক্তের জায়গার। রক্তের আবার রয়েছে বিভিন্ন গ্রুপ।

সবুজ তাপস দর্শন-সচেতন কবি। ‘জলপাড়া’তেও এর প্রমাণ মেলে। থেলিস জল নিয়ে কবিতা করেননি, ¯্রফে দর্শনতত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। পাশ্চাত্য দর্শনে এ-তত্ত্বের বেশ সমালোচনা রয়েছে। বিখ্যাত দার্শনিক এনাক্সিমেন্ডার, এনাক্সিমিনিস, হেরাক্লিটাস ও এম্পিডক্লেস তার জলদর্শনের সাথে বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেন। ভারতীয় সক্রেটিস রামকৃষ্ণের যে কথাটি তুলে ধরেছি, তা ধর্মীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই সমকালে বলা হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের বিভিন্ন চিন্তা¯্রােতের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন ব্রহ্মানুভূতি অর্জন বা ভগদ্দর্শন। লালনও এই একই ভাববাদিতার জায়গা থেকে কাজ করেছেন। সবুজ তাপস ভাববাদী কবি নন, বস্তুবাদী ঘরানার কবি। ভাববাদি কবিরা তাদের লেখায় যেসব দৃষ্টান্তহীন শব্দ ব্যবহার করেন, তার কবিতায় এসবের সাক্ষাৎ মেলে না। এ-কবিতায়ও তা দেখছি। এ-কবিতার প্রতিটি শব্দ অর্থপূর্ণ এবং বাস্তব দৃষ্টান্তে উপস্থাপনযোগ্য। দর্শনের ভাষায়, যা অর্থপূর্ণ তা-ই যাচাইযোগ্য আর যা যাচাইযোগ্য তা-ই অর্থপূর্ণ। অর্থপূর্ণ বা যাচাইযোগ্য হওয়া মানে শব্দটি যার নাম তার বাস্তব অস্তিত্বের নিশ্চয়তা পরীক্ষার উপযোগী হওয়া। অর্থাৎ এটি অর্থপূর্ণ শব্দের সুবোধ কবিতা। তবে কোন ধরণের বস্তুবাদে তার অবস্থান? দৃষ্টান্তবাদের উপর ভিত্তি করে বলতে পারি, প্রচলিত ধারার বস্তুবাদে তার আস্থা নেই; তিনি ‘Neither theist nor atheist, but religious’ ধারার বস্তুবাদী। অর্থাৎ দৃষ্টান্তবাদী বস্তুবাদে তার আস্থা।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: